ডনবাসকে নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব জেলেনস্কির

ডনবাসকে নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব জেলেনস্কির

ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে হালনাগাদ এক শান্তি পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সর্বশেষ প্রস্তাবে পূর্ব ইউক্রেন থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা এবং সেখানে নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল গঠনের কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে ফ্লোরিডায় সপ্তাহান্তে হওয়া আলোচনায় ২০ দফার এ কাঠামো চূড়ান্ত হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে কথা বলার পর বুধবার মস্কোর প্রতিক্রিয়া জানা যাবে। তিনি এ পরিকল্পনাকে যুদ্ধ শেষ করার প্রধান কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাব রয়েছে। ভবিষ্যতে রাশিয়া আবার ইউক্রেনে আগ্রাসন চালালে সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত।

ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস নিয়ে জেলেনস্কি বলেন, সেখানে একটি ফ্রি ইকোনমিক জোন বা মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের বিষয়টি একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় আছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইউক্রেন সেনা প্রত্যাহারের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল অথবা মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব খুঁজছে। তবে যেসব এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহার করা হবে, সেগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব ইউক্রেনেরই থাকতে হবে বলে তিনি জোর দেন।

জেলেনস্কি বলেছেন, দুটি পথ আছে, একটি হলো যুদ্ধ চলতেই থাকবে, অথবা সম্ভাব্য সব অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২০ দফার এ পরিকল্পনাকে কয়েক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফের আলোচনায় তৈরি হওয়া ২৮ দফার নথির হালনাগাদ সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগের নথিটি মূলত ক্রেমলিনের দাবির প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল বলে বিবেচিত হয়েছিল।

রাশিয়া বরাবরই শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে ইউক্রেনকে পূর্ব ডনেস্ক অঞ্চলের প্রায় একচতুর্থাংশ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। ওই অঞ্চলের বাকি অংশ ইতোমধ্যে রুশ বাহিনীর দখলে। জেলেনস্কি বলেন, ভূখণ্ড সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নেতা পর্যায়ে মীমাংসা করতে হবে। তবে নতুন খসড়ায় ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং শান্তিকালে ৮ লাখ সদস্যের সেনাবাহিনী রাখার অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে।

হালনাগাদ পরিকল্পনার বড় অংশই সাম্প্রতিক বার্লিন আলোচনার প্রতিফলন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে গত সপ্তাহান্তে আলোচনার কেন্দ্রস্থল ছিল মায়ামি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল আলাদাভাবে রুশ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ এবং ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে।

নতুন কাঠামোয় ভূখণ্ড প্রশ্নে আগের চেয়ে বিস্তারিত থাকলেও ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য হয়নি বলে স্পষ্ট। জেলেনস্কি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ডনেস্কের যে ২৫ শতাংশ এলাকা এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখানে যদি ভারী অস্ত্র পাঁচ, ১০ বা ৪০ কিলোমিটার পেছনে সরিয়ে একটি প্রায় নিরস্ত্রীকৃত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়া হয়, তবে রাশিয়াকেও একইভাবে ৫, ১০ বা ৪০ কিলোমিটার সরে যেতে হবে।

বর্তমানে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের ‘ফর্ট্রেস বেল্ট’ শহর স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছে। তারা ইতোমধ্যে সিভেরস্ক শহর দখল করেছে। তবে ডনেস্ক নিয়ে এ ধরনের সমঝোতা প্রস্তাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সন্তুষ্ট হবেন, এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে। চলতি মাসে তিনি বলেছেন, ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহার না করলে রাশিয়া শক্তি প্রয়োগ করে পুরো পূর্ব ইউক্রেন দখলে নেবে।

তবু প্রায় চার বছর ধরে চলা সর্বাত্মক যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্প একটি চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছেন। জেলেনস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার সামর্থ্য রাশিয়ার নেই। তিনি বলেন, তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলতে পারে না যে তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিরুদ্ধে। যদি তারা বাধা দেয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের ব্যাপকভাবে অস্ত্র দেবেন এবং তাদের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন।

জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, ডনেস্কে যদি মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়া হয়, সেটি অবশ্যই ইউক্রেনের প্রশাসন ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। কোনোভাবেই তথাকথিত রুশ পুলিশের হাতে নয়। তখন বর্তমান ফ্রন্টলাইন হবে ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমানা। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত বরাবর আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন থাকবে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তাবিত কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং দিয়ে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগকে রাশিয়া আগেই ‘নির্লজ্জ হুমকি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

জেলেনস্কি জানান, পুরো শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে গণভোট আয়োজন করতে হবে। ডনবাসে মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে কেবল গণভোটের মাধ্যমে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাশিয়ার দখলে থাকা জাপোরিজ্জিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশেও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করতে হবে এবং রুশ সেনাদের দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক, মিকোলাইভ, সুমি ও খারকিভ এই চার অঞ্চল থেকেও সরে যেতে হবে।

পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার যৌথ পরিচালনার কথা থাকলেও কিয়েভ এতে একমত নয় বলে জানান জেলেনস্কি।
পরিকল্পনার মূল দফাগুলোতে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে একটি অনাগ্রাসন চুক্তির প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও থাকবে। ন্যাটোর আর্টিকেল ফাইভের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তার পাশাপাশি শান্তিকালে ইউক্রেনকে সর্বোচ্চ ৮ লাখ সেনা রাখার অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চললেও তা এখনও নথির অংশ হয়নি বলে জানান জেলেনস্কি। নতুন কাঠামোতে ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানে নিষেধাজ্ঞার কোনও উল্লেখ নেই, যা আগের ২৮ দফার পরিকল্পনায় ছিল এবং রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবি। বরং এতে ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচির প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেন ইইউর প্রার্থী দেশ হলেও আলবেনিয়ার মতো কয়েকটি দেশকে অগ্রাধিকার তালিকায় এগিয়ে রাখা হচ্ছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অংশগ্রহণে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ইউক্রেন বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। অন্য দফাগুলোর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর যত দ্রুত সম্ভব ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের কারণে দেশে সামরিক আইন জারি থাকলেও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই নির্বাচনের পক্ষে চাপ দিয়ে আসছে।

পোষ্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2023 tulshigonga24.com privacy-policy Contact Us About Us
Design BY NewsTheme